শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০   আষাঢ় ২৬ ১৪২৭   ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪১

১১৬

সেদিন এদেশে ফুটবলের জায়গা নিয়ে নিয়েছিল ক্রিকেট

প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০২০  

‘১৩’ সংখ্যাটি অনেকের কাছেই অপয়া। ‘আনলাকি থার্টিন’ বলে সাধারণে সংখ্যাটিকে অশুভ বলেই পরিগনিত হয়। ফলে প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্বেও অনেকেই এই দিনটিতে শুভ কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। অন্য কোনো দিনের জন্য জমিয়ে রাখেন। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এই অপয়া সংখ্যাটি সবচেয়ে পয়মন্ত! কেননা আজ থেকে ২২ বছর আগের এই দিনেই এদেশের ক্রিকেটের আকাশে উঠেছিল নতুন এক সূর্য্য। বিশ্ব ক্রিকেটে সেদিন অবাক বিস্ময়ে এক নতুন শক্তির অভ্যুদয় দেখেছে। ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে আকরাম খানের নেতৃত্বে কেনিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছিল বাংলাদেশ। আর সেদিন থেকেই ছোট্ট এই ব-দ্বীপের প্রাণের খেলা ফুটবলকে ছাপিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের চিত্তে জায়গা করে নেয় ক্রিকেট।

এর আগ পর্যন্ত ফুটবলই ছিল প্রথম ও একমাত্র খেলা যা এদেশের ক্রীড়া প্রেমীদের বুঁদ করে রাখত। মাঠের খেলা মানেই যেন ওই ফুটবলই। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ দেখতে তখন মাঠে দর্শকের ঢল নামত। ১৯৯০ সালেই অবশ্য ফুটবলকে পেছনে ফেলে ক্রিকেটকে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার অনন্য সুযোগটি এসেছিল। কিন্তু সেমির লড়াইয়ে বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের কাছে হেরে গেলে অনন্য সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় টাইগার কন্টিনজেন্ট।

এভাবে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৪- টানা পাঁচ বার বিশ্বকাপে খেলার বর্ণিল স্বপ্ন নিয়ে আইসিসি ট্রফিতে অংশ নিয়েছে লাল সবুজের দল কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসতে হয়েছে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে। অবশেষে ১৯৯৭’র আসরে দীর্ঘ দিনের লালিত সেই স্বপ্ন পূরণ হয় আকরাম, বুলবুল, নান্নু, রফিক পাইলটদের হাত ধরে।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে সেদিন মরিস ওদুম্বে, স্টিভ টিকোলো, টনি সুজিদের হারিয়ে জাতীয় বীরের খেতাবে ভুষিত হয়েছিলেন আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, মোহাম্মদ রফিক, সাইফুল ইসলাম খান আর হাসিবুল হোসেন শান্তরা। কেনিয়াকে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ২ উইকেটে হারানোর মধ্য দিয়ে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। লাল-সবুজ পতাকা উড়েছিল পতপত করে। আকরাম খানসহ ‘ওরা এগারো জন’ জায়গা করে নিয়েছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে।

গৌরবের সেই সাফল্যের ২২ বছর পরে স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে অধিনায়ক আকরাম খান জানালেন, ‘আমি প্রথম বাংলাদেশ দলে সুযোগ পাই ১৯৮৮ সালে। ১৯৯০ সালে বিশ্বকাপে খেলার ভালো একটি সুযোগ ছিল। আপনি জানেন ওই সময় আমাদের আশ পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বিশ্বকাপে খেলছিল। কিন্তু আমরা ওখানে যেতে পারছিলাম না। ১৯৯৪ সালে কেনিয়াতে হারার পর আমাদের ক্রিকেটটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ফলে ১৯৯৭ সালটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এল। কেননা ওই বছর যদি না পারতাম তাহলে ক্রিকেট টিকেই থাকত না। কারণ তখন এখনকার মতো ওত সুযোগ সুবিধা ছিল না। আর তখন বাংলাদেশের প্রথম খেলা ছিল ফুটবল। তো ১৯৯৭ সালে যখন খেলতে গেলাম আমাকে অধিনায়ক করা হলো। আমি বুঝে গিয়েছিলাম আমাদের মূল লক্ষ্যই হলো বিশ্বকাপ।’

‘তো আমি ওভাবে সবকিছু চিন্তা ভাবনা শুরু করলাম। জানতাম যে এটা আমার কারিয়ারের সবচে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি আমি সফল হই তাহলে কথা নেই। না হলে শেষ হয়ে যাবে। তো সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে দলের সবার ভূমিকাই ভালো ছিল। এবং আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এবং তখনই ফুটবলকে পেছনে ফেলে ক্রিকেটটা বাংলাদেশের প্রথম খেলার জায়গা করে নিল। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল যখন ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে পেরেছিলাম এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক লাখ মানুষ নিয়ে যে সম্মাননাটা আমাদের দিয়েছিলেন। সারা বিশ্বেই আমাদের ক্রিকেটটা পরিচিতি পেল। এর মধ্য দিয়েই আমরা আশরাফুল, মাশরাফি, তামিম সাকিব ও মুশফিক ও মোস্তাফিজের মতো বিশ্বমানের ক্রিকেটার পেলাম। অতএব বাংলাদেশ ক্রিকেট আজকের অবস্থানে আসতে ওই ট্রফিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

৯৭’র ওই আসরে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে সেমি ফাইনালেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছিল টিম বাংলাদেশ। ফলে ফাইনালে কেনিয়ার বিরুদ্ধে না জিতলেও আকরাম, নান্নুদের স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হত না। তবে ঐতিহাসিক সেই ফাইনালে ৩৩ বলে ২৬ রান করা মিনহাজুল আবেদীন নান্নু মনে করেন, ফাইনাল খেলা সব সময়ই বাড়তি রেমাঞ্চের ও গর্বের। ‘ফাইনাল ম্যাচ তো ফাইনাল ম্যাচই। এটা যে কোনো দলকে মানসিকভাবে অনেক উজ্জীবীত করে। আমাদের মধ্যেই তেমনি কাজ করেছিল। এরপর তো ফাইনালই জিতে গেলাম।’

অথচ বৃষ্টি না হলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারতি হয়ে যেত একদিন আগেই (১২ এপ্রিল)। কিন্তু বৃষ্টি তা প্রলম্বিত করল। তাতে সবার কপালে কিছুটা দুশ্চিন্তার রেখা ফেলে দিয়েছিল বলেও জানালেন টাইগারদের বর্তমান এই প্রধান নির্বাচক। ‘বৃষ্টির কারণে কার্টেল ওভারের ম্যাচ হলো। তখনকার প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্ত সংস্করণে কার্টেল ওভারে মানে ২৫ ওভারে ১৬৬ রান সহজ ছিল না। কিন্তু কিছু্ করার ছিল না। কারণ মালয়েশিয়াতে তখন বৃষ্টির মৌসুম। সেই হিসেবে টেনশন কাজ করত। তাছাড়া আমরা কেউই কার্টেল ওভার খেলে অভ্যন্ত নই। তারপরেও আমরা একটি দল হিসেবে খেলতে পেরেছি বলেই সাফল্যটি এসেছে।’

নিউজ বাংলার আলো
নিউজ বাংলার আলো
এই বিভাগের আরো খবর