বুধবার   ১৬ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ১ ১৪২৬   ১৬ সফর ১৪৪১

১৭০

সমর্পণ || জাহিদ রাজ রনি

জাহিদ রাজ রনি

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০১৯  

আমার কলেজের সহপাঠী নাজিম কয়েকবছর আগে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার কারণ গৎবাঁধা এবং অতি নগন্য, আমাদেরই আরেক সহপাঠী তুবাকে সে ভালোবাসতো। তুবার যখন বিয়ে হয়ে যায় অন্য এক পুরুষের সাথে, নাজিম তখনও আমাদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলো। তাকে দেখে এক প্রেমদ্রোহী যুবকের মতোই লাগছিলো। যে যুবক ভালোবাসার অলীগলী ঘুরে বড় ক্লান্ত হয়েছে। আমরা; আমি, ইসমাইল কিংবা সুমন- আমরা কেউই বুঝিনি তখন; কি দ্রোহ বুকে চেপে নাজিম বসে ছিলো স্বাভাবিক মুখ করে।

এরপর সময় যেভাবে কাটার সেভাবেই কেটেছে। আমরা কলেজের ফাইনাল পরিক্ষা শেষ যে যার মতো আলাদা হয়ে গেছি। আমি ঢাকায়, বাঁকিদের খবর সেভাবে জানতাম না। এবং তুবার বিয়ে কিংবা নাজিমের ব্যর্থ প্রেম আমাদের কখনো কলেজের বন্ধুদের সাথে দেখা হলে আড্ডায় বড়জোর হাসির খোরাকই হলো, এর বেশিদূর আর ভাবিনি৷ ঢাকায় কোচিং এ ভর্তি হলাম, নতুন বন্ধু হলো। একদিন এক সন্ধ্যায় কারো ফোন কলে জানলাম, নাজিমের আত্মহত্যার খবর। শিউরে উঠেনি। মনে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই জানতে চেয়েছি কি কারণ। কারণ আর কিছুই না, তুবার সন্তান হয়েছে। তুব হয়েছে আরেকজনের বাচ্চার মা। তার স্বামী সে বাচ্চার বাবা।

কোথায় যেন পড়েছি, পরপুরুষের হয়ে যাওয়া প্রেমিকার সন্তান হলেই কেবল প্রেমিকা যে অন্যের হয়ে গিয়েছি, এই দুঃখটা টের পাওয়া যায়। সে দুঃখ আমার সহপাঠী নাজিম ভালোই টের পেয়েছে। বেচারা বিদায় জানিয়েছে জীবনের।

আমি ভাবি, কি গভীর বিতৃষ্ণা থেকে একেকটা মানুষ বেছে নেয় মৃত্যুকে। ঠিক কতটা অসহ্য হলে মানুষ জীবনের আগত, অনাগত সকল সম্ভবনা মাটি করে ঝুলে পড়ে। হায়! কি এক অন্তহীন ব্যাথা মানুষকে করে ফেলে বোধহীন!

আমরা বন্ধুরা, নাজিমকে সেভাবে মনে রাখিনি। মনে রাখার প্রয়োজনও ছিলোনা। কোন স্মরণসভায় কেউ বক্তব্য রাখেনি তার ভালোবাসার উপর, মন ভাঙার অপরাধে কোন আদালতে মামলা হয়নি। তুবার গোছানো জীবন থেমে যায়নি নাজিমের মৃত্যুতে৷ থেমে যায়নি আমাদের জীবনও। আমরা যে যার মতো পরবর্তী কিছু আড্ডায়, কখনো ঈদে পার্বনে স্কুলের সবাই একত্র হলে নাজিমকে নিয়ে স্মৃতিকাতর হলাম। সেটা হবার দরকার ছিলো বলেই হলাম। তারমধ্যেই অতিপ্রাকৃত কিছু ছিল না, বরং মৃত বন্ধু মনে না করলে জীবতরা আবার কি বলবে- এই ভেবে মনে করা!

এইসব বহু পুরনো ঘটনা। মানুষ হাসিমুখ মনে রাখে। ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকা সহপাঠীর বিকৃত মুখ কারো স্মৃতি বেশিদিন ধরে রাখেনা। একসময় আমাদের কোন আড্ডাতে নাজিম কখনো এলোনা, এবং জীবনের মারপ্যাচে আমাদের আড্ডাও আর সেভাবে হলোনা। আমরা কেউ কেউ স্ব স্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলাম, কেউ উপহাস করলাম ভাগ্যের।

এক ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কোন কারণে বাজারে গিয়ে দেখলাম তুবাকে। নাজিমের তুবা! খুব পরিবর্তন হলেও, চেনা তাকে যাচ্ছিলো। তার হাত ধরে ছিলো সাত-আট বছরের ফুটফুটে এক মেয়ে, কোলে আরেক কণ্যা শিশু। তুবাকে দেখে আমি কথা বললাম না। না না, নাজিমের আত্মহননে নয়- বরং কিই বা বলবো এই ভেবে। তবে আমি দেখলাম তার চোখ, সে চোখে কোন হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের ব্যাথা নেই; এই চোখ এক সংসারী গৃহিণীর চোখ।

জীবন- তিন অক্ষরের এই শব্দের মানে আমি প্রায়শই ভাবি। তাতে জীবনের কিছু যায় আসেনা। কখনো মনে হয় জীবন এক অন্তহীন যাত্রা। আর কখনো মনে হয় জীবন কেন এতো ছোট। ঘুরেফিরে সময় আপেক্ষিক তত্ত্বে এসে দাঁড়াই। তবে জীবন মানে যে এক নিশ্চিত অপেক্ষা, এতোটুকু বুঝি। এই অপেক্ষা মহাকালে মিশে যাবার; এর মাঝে ঘটে যায় প্রেম, বিরহ, সংসার, সংশয়!

নিউজ বাংলার আলো
নিউজ বাংলার আলো