মঙ্গলবার   ১৪ জুলাই ২০২০   আষাঢ় ২৯ ১৪২৭   ২৩ জ্বিলকদ ১৪৪১

১১৮

এ লড়াইয়ে জিততেই হবে

ডা. কামরুল হাসান খান

প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২০  

অদৃশ্য এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব পুরো বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে। কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন। তার গতিপথ অপ্রতিরোধ্য- পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিজ্ঞানের আধুনিকতম যুগে, মানুষের অগোচরে, মানুষকে অসহায় করে। কভিড-১৯ তিন ধরনের হচ্ছে- মৃদু, মাঝারি আর মারাত্মক। এর মধ্যে মৃদু রোগীর সংখ্যাই বেশি- ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ। ইতোমধ্যে বিরাট সংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বশেষ আক্রান্ত দেশ বাংলাদেশ। ২ এপ্রিল বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা ৫৬, মৃত্যুর সংখ্যা ৬ এবং সম্পূর্ণ সুস্থ ২৬ জন। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মিজোরাম, মনিপুর, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটানসহ এসব অঞ্চলে তুলনামূলক প্রাদুর্ভাব অপেক্ষাকৃত কম। বিশ্বব্যাপী নানা গবেষণা চলছে। এর মধ্যে বলা হয়েছে, গ্রীষ্ফ্মপ্রধান দেশে অপেক্ষাকৃত কম হতে পারে; কিন্তু আমেরিকার লুজিয়ানা ও মিয়ামি বর্তমানে উষ্ণ বলে রোগীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়।
চীনের পর বিশ্বব্যাপী দ্রুত জ্যামিতিক হারে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কোনো দেশে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে আবার কোথাও বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম থেকেই সময়োচিত গাইডলাইন এবং দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমেই বলেছে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বাড়াতে। এটা অনুসরণ করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর অনেকটা সফলতা পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কভিড-১৯-এর গতিপ্রকৃতির ওপর বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ মন্তব্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দেশের মৃত্যুর হারের বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-১. জনসংখ্যার বয়সের অনুপাত; ২. স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও ৩. পরীক্ষার সংখ্যা।
১. জনসংখ্যার বয়সের অনুপাত-বয়স্ক লোকেরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুবরণ করছেন। পাশাপাশি যাদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ আছে, যেমন- ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসের অসুখ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিম্নমুখী। যে দেশে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেশি, সে দেশেই মৃত্যুহার বেশি দেখা যাচ্ছে।
২. স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা :রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধার মধ্যে প্রয়োজন যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসার সরঞ্জামাদি, হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ও আইসিইউ। এখানে আইসিইউর গুরুত্বটাই বেশি দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ রোগীরা খুব কম সময়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসযন্ত্র অকার্যকর করে ফেলে। এটা প্রতিরোধে আইসিইউর কোনো বিকল্প নেই। প্রতি লাখে মানুষের বিপরীতে জার্মানির আইসিইউ শয্যা সুবিধা ২৯টি, যুক্তরাষ্ট্র ৩৪, ইতালি ১২ আর স্পেনে ১০টি। শেষের দুই দেশের মৃত্যুহার অন্য দেশগুলোর চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু উল্টো চিত্র দক্ষিণ কোরিয়ায়, মাত্র লাখে ১০টি। তারপরও তারা মৃত্যুহার নামিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে এক ভাগেরও নিচে। খুব দ্রুত সংক্রমণের হারও কমিয়েছে, যা সম্ভব হয়েছে হোম কোয়ারেন্টাইনের কঠোর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা :সেখানে এখন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০৭৫৩৫। অথচ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগে দেড় মাসের বেশি সময় পেয়েছিল। দুর্ভাগ্য, ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টাকে প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। এপ্রিলজুড়ে সেখানে লকডাউন ঘোষণা করেছে।
প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ :গত ৮ মার্চ ২০২০ বাংলাদেশে প্রথম কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর আগে চীনের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচার ও প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে। সরকার, গণমাধ্যম ও পত্রপত্রিকা সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং জনগণ যথেষ্ট সচেতন হয়েছে বলে মনে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই সময়োচিত দিকনির্দেশনা দিয়ে চলেছে। প্রথমেই তারা বলেছে : পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। দ্বিতীয়ত বলেছে : সন্দেহভাজন ব্যক্তি (সোর্স) পৃথক্‌করণ, পরীক্ষা করা আর পর্যাপ্ত চিকিৎসা প্রদান। সর্বশেষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৬টি পরামর্শ দিয়েছে। এসবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করণীয় নির্ধারণ কেেরছে- সচেতনতা :অতি সাধারণ কিছু বিষয় মেনে চললে একজন নিজেকে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ রাখতে পারবে সেগুলো হচ্ছে- ক. হাঁচি-কাশি থেকে ১ মিটার (৩ ফুট) দূরত্ব বজায় রাখুন; খ. হাতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে- সন্দেহজনক স্থানে হাতের স্পর্শ লাগলে হাত ভালো করে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। নাক-মুখ-চোখ হাতের স্পর্শ থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন; গ. মাছ, মাংস, ডিম ভালো করে সিদ্ধ করে খাবেন; ঘ. ভিড় এড়িয়ে চলুন। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার করোনামুক্ত ঘোষণা না করবে, ততক্ষণ এগুলো মেনে চলতে হবে।
গোটা বিশ্ব আজ করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত, এগিয়ে চলেছে এক অজানা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে- মানুষের জীবন গভীর সংকটের মুখোমুখি, অচল হয়ে পড়েছে সভ্যতা, ধ্বংসের মুখে অর্থনীতি। এ মুহূর্তে অজানা এক ভয়ংকর লড়াইয়ের মুখোমুখি বিশ্ববাসী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ রকম ভয়াবহ সংকট বিশ্ববাসী দেখেনি। অতীতের সব দুরবস্থাকে অতিক্রম করে চলেছে করোনাভাইরাস-এক অদৃশ্য অণুজীব। ব্যর্থ হচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মহাশক্তি ও অর্থনীতি। মানছে না ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, সীমানা। এক কাতারে নিয়ে এসেছে গোটা বিশ্বকে।
আমাদের বাংলাদেশের রয়েছে লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। লড়াই করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা এনেছি, এনেছি গণতন্ত্র। প্রধানমন্ত্রী সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। বাংলাদেশের সব মানুষকে দলমত-ধর্ম নির্বিশেষে কঠিন দৃঢ় ঐক্যবদ্ধ থাকতেই হবে। বাংলাদেশের মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন পরাজয়ের ইতিহাস নেই। আজ এখনই এক সময়, যখন কেউ নিরাপদ নয়। তাই সবাইকে সব নিয়মকানুন, নির্দেশনা অনুসরণ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এ লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে।
অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজ বাংলার আলো
নিউজ বাংলার আলো